শিশুশ্রম ও কিছু ভাবনা

কুয়াশঢাকা ভোর।  সবাই যখন শীতের সকালে লেপের আদরে সুখনিদ্রায় বিভোর, তখন আমি  ‘স্বাস্থ্য সকল সুখের মুল’ নামক বাণীটি জপতে জপতে বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঢুকি ইষ্টার্ণ হাউজিং-শেষ প্রান্ত দিয়ে।  চারিদিকে কুয়াশা, দুই হাত দুরের জিনিসও দেখা যায় না । গাছ-পালার প্রায় ঝাপসা অবয়ব শুধু বোঝা যায় । হাঁটতে থাকি লাল ইট বিছানো ট্রেক দিয়ে। হাঁটতে বেশ লাগছে। কিন্তুু ঠান্ডা বাতাস মনে হয় আর কোন ফাঁক-ফোঁকর না পেয়ে আমার নাক দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করছে। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম গোলাপ বাগানের দিকে । অজস্র গোলাপ ফুটে আছে চারিদিকে ..  পাঠক নিশ্চয় বিরক্ত হচ্ছেন ! কিসের মধ্যে কি পান্তা ভাতে ঘি ! হেডিং আর সাবজেক্টের মধ্যে মিল না দেখে । আসলে আমি একটু প্রকৃতি প্রেমিক বলে প্রকৃতির বর্ণনা দেওয়ার লোভটা সংবরণ করতে পারলাম না ।



 গোলাপ বাগান থেকে একটি পিচঢালা রাস্তা চলে গেছে চিড়িয়াখানার দিকে। সেদিকে হাঁটতে থাকি এবং একসময় নিজেকে আবিষ্কার করি গেটের বাইরে। কি আর করা ... চেপে বসি বাসায় ফেরার জন্য। রাস্তায় লোকজনের আনাগোনা কম। এতক্ষনে কুয়াশার চাদর ভেদ করে সুয্যিমামা উঁকি দিয়েছে। শিয়ালবাড়ীর মোড়ে এসে চোখ আটকে গেল একটি দৃশ্য দেখে ।  কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। মনের মধ্যে একটি সকরুণ রস বয়ে গেল ।  হাফ প্যান্ট পরা একটি ছোট ছেলে । পানির ফিল্টারের জার ভর্তি একটা ভ্যান ঠেলছে । বয়স আর কত হবে- নয় কি দশ। খালি পা । মায়াবী ফুটফুটে চেহারা । অতিকষ্টে ঠেলছে ভ্যানটি । ধারনা করলাম, ভ্যানটির চালক হযতো ছেলেটির বাবা। আবার নাও হতে পারে। হয়তো তার বাবা এই বয়সেই ছেলেটিকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে কিছুটা বাড়তি রোজগারের আশায় । আবার হয়তো ছেলেটি নিজেই কাজ জোগাড় করেছে গরীব বাবা মাকে সাহায্য করার জন্য। মনের মধ্যে বিচিত্র অনুভুতি খেলা করছে। অভ্যাসবশত: মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুললাম। ছবি তুলে মনটা আরোও খারাপ হয়ে গেল। নিজেকেই প্রশ্ন করলাম-এই ছবি তোলার কি দরকার ছিল ?  হয়তো, এই ছবি দেখে বন্ধু-বান্ধবরা বাহবা দিবে,ফেইস-বুকে দিলে বাড়তি কিছু লাইক পাওয়া যাবে। হয়তো কিছু এনজিও কিংবা ফটো এজেন্সি কিনে নিতেও পারে। কিন্তু আসলে কি কোন লাভ হবে? এটাতো বাংলাদেশের নেগেটিভ ইমেজ। অবশ্য বাংলাদেশের অনেক ফটোগ্রাফার আছে যারা বাংলাদেশের নেগেটিভ ইমেজ বর্হিবিশ্বে তুলে ধরার জন্য সদা তৎপর । হয়তো কিছু বাড়তি ডলারও আসছে পকেটে । আর প্রদশর্নীর উদ্দেশ্যে একটু আরেকটু বিদেশ ঘোরাঘুরিও করেন তারা। হয়তো বিদেশীদের পিঠ-চাপড়ানীতে গর্বে ফুলে উঠে তাদের বুক।  কিন্তুু সেই ছেলেটি কথা কি তাদের মনে থাকে? যার জন্য তিনি আজ এত্তোবড় ফটোগ্রাফার! যার যন্ত্রণাকিষ্ট মুখের ছবি তুলে আপনি বাহ¦বা পাচ্ছেন, তার ভাগ্য উন্নয়ণে আপনার ভুমিকা আছে কি?



আমাদের দেশের নেগেটিভ দিক ছাড়াও তো অনেক পজিটিভ দিক আছে ্ যা নিয়ে আমরা সত্যিই গর্ব করতে পারি। আমরা আজ আর তলা বিহীন ঝুঁড়ি নই। ত্রিকেটে, তথ্যপ্রযুক্তি প্রায় সবক্ষেত্রেই আমরা এগিয়ে গেছি এবং এগিয়ে যাব। তাই আসুন পজিটিভ বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরি, আর তা নাহলে তো নিজের সাথেই প্রতারনা করা হবে।






ফটোসপ টিউটোরিয়াল : ৩৬০ ডিগ্রী প্যানোরামা

বন্ধুরা কেমন আছেন ? আজকে আমি আপনাদেরকে একটি মজার ফটোশপ টিউটোরিয়াল শেখাব। যারা নিয়মিত ফটোগ্রাফির খোঁজখবর রাখেন, তারা হয়তো বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ৩৬০ ডিগ্রী প্যানোরোমা চিত্র দেখে থাকবেন। আমাদের দেশে এই ধরনের আলোকচিত্র দেখা যায় না। পাশ্চাত্যদেশে এই ধরনের আলোকচিত্রের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। ফটোশপ ব্যবহার করে একটি সাধারণ আলোকচিত্রকে কিভাবে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আংগিকে পরিবেশন করা যায় , তা এই টিউটোরিয়ালে বর্ণনা করা হয়েছে । ৩৬০ ডিগ্রী প্যানোরোমা –এর জন্য প্যানোরোমিক চিত্র হলে সবচেয়ে ভালো হয় । আজকাল স্মার্ট ফোনগুলোতে প্যানোরোমা ছবি তোলার প্রযুক্তি রয়েছে। আপনার ক্যামেরায় প্যানোরামা ফিচারটি থাকলে সেটি ব্যবহার করে ছবি তুলতে পারেন ।  নিচের প্যানোরোমিক ৩৬০ ডিগ্রী ছবিটি দেখুন:

৩৬০ ডিগ্রী  প্যানোরোমা


সাধারন ছবি ব্যবহার করেও প্যানোরোমিক ৩৬০ ডিগ্রী ছবি বানাতে পারেন, সেক্ষেত্রে ফটোশপের ক্রপ টুলটি ব্যবহার করতে হবে।  এখানে  মানিকগঞ্জের বালিআটি রাজবাড়ীতে আমার তোলা একটি প্যানোরোমা ছবিটি ব্যবহার করেছি।

প্যানোরোমা আলোকচিত্র


ধাপ-১: ছবিটি ফটোশপে ওপেন করুন। এখানে আমার ছবিটিতে দু’পাশের গাছ-পালা ক্রপ টুল ব্যবহার করে, বাদ দিয়েছি। ইমেজ থেকে ইমেজ সাইজ-এ যান (Image-Image Size) । ইমেজ সাইজ উইন্ডোতে ছবির আকার দেখা যাবে। ( Constrain Proportions  ) প্রপার্টি আনচেক করে দিন । (Width) মান যা আছে সেই মানটি (Height)-তে বসান । (OK) চাপ দিন । ছবিটি বর্গাকারে দেখা যাবে।


ধাপ-২: ইমেজ মেনু থেকে (Rotate Canvas) যান এবং (180) সিলেক্ট করুন। ছবিটি ১৮০ ডিগ্রি উল্টে যাবে।



ধাপ-৩: এ পর্যায়ে (Filter) ড্রপ ডাউন মেনু থেকে (Distort) এবং সেখান থেকে (Polar Coordinates) সিলেক্ট করুন। (Polar Coordinates)উইন্ডোটি ওপেন হবে। লক্ষ্য করুন, (Rectangular to Polar) চেক দেওয়া আছে । (OK) চেপে বের হয়ে আসুন ।



ধাপ-৪: এ পর্যায়ে ছবিটি বিভিন্ন এ্যাংগেলে ঘুরিয়ে আপনার পছন্দমতো জায়গায় নিয়ে যান । আপনার রুচিমাফিক শার্পনেস, স্যাটুরেশান বাড়িয়ে নতে পারেন। খুব সুন্দর একটি ৩৬০ ডিগ্রী প্যানোরামা ছবি পেয়ে গেলেন । আপনার সৃজনশীলতা ব্যবহার করে যেকোন ছবি যেমন, ল্যাšডস্কেপ,সিটিস্কেপ কে ছবিকে ৩৬০ ডিগ্রী প্যানোরমায় পরিবর্তিত করতে পারবেন ।  বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন, আশা করি সবাই পছন্দ করবে।

লালবাগ কেল্লা, ঢাকা
ঢাকার বসতি


ভালো ভাবে বোঝার জন্য নিচের ভিডিওটি দেখুন 








আর সর্বশেষে এই টিউটোরিয়াল সর্ম্পকে আপনার মতামত ব্যক্ত করলে আনন্দিত হবো । 

ড্রানড্রবিয়াম অর্কিড : আপনার গৃহকোন হোক নান্দনিক

Dendrobium orchid

ফুল মনে প্রশান্তি বয়ে আনে। অশান্ত মনকে শান্ত করে। সারাদিনের কর্ম ব্যস্ততার পরে বাসায় ফিরে এসে ঘরের বারান্দার এক কোনে ফুটন্ত  অর্কিড ফুল আপনাকে বিমোহিত করবে। আজকাল বাংলাদেশে অর্কিড ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। অর্কিড এখন কোন দুর্লভ ফুল নয়। একসময় যা ছিল উচ্চবিত্তে বিলাস, এখন তা শোভা পাচেছ মধ্যবিত্তের গৃহকোনে।

অনেকের ধারনা, অর্কিড ফুল খুব দামী  এবং এর যতœপাতি ও ব্যায়সাপেক্ষ। কথাটা আংশিক সত্য। কিছু কিছু প্রজাতির অর্কিড আছে, যেগুলো আসলেই দামী । যেমন, ফিলনোপসিস গোত্রের অর্কিড। ঢাকার আগারগাত্ত-এর বিভিন্ন  নার্সারীতে  একেকটি ফিলোনপসিস অর্কিডের দাম  প্রতিটি ১২০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত আর ক্যাটলিয়া গ্রোত্রের অর্কিডের দাম পড়বে ৪০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। 



এখানে আমি ম্যধবিত্ত-এর নাগালের ভিতর যে অর্কিড নার্সারীতে কিনতে পাত্তয়া যায়-সেই ড্রানড্রবিয়াম অর্কিডের লালন পালন এবং পরিচর্যা বিষয়ে আলোচনা করব।

ড্রানড্রবিয়াম অর্কিড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ যেমন থাইল্যাšড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া,ভারত,ভ’টান ও বাংলাদেশে ব্যাপকহারে দেখা যায়।  অর্কিড ফুলের মধ্যে  ড্রানড্রবিয়াম সবচেয়ে বড় প্রজাতি। ১২০০ অধিক জাতের ড্রানড্রবিয়াম অর্কিড আছে। সবধরনের আবহাওয়ায় এই প্রজাতির অর্কিড দেখা যায়। উষ্ণ ভ’মি, নি¤œভ’মি থেকে উচ্চভ’মি, শীতল পর্বতমালা, গ্রীষ্মমন্ডলীয় বনভ’মিতে এই অর্কিড জন্মায়। সবচেয়েূ জনপ্রিয় হলো হাইব্রিড ফেলাইনোপসিস গ্রোত্রের অর্কিড্। কি তাদের রঙের বাহার!। এই  অর্কিড ফুল সারা বছরেই ফুল দেয়। প্রায় মাসদুয়েক তরতাজা থাকে। ড্রানড্রবিয়াম অর্কিডের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর বর্ণনা নিচে দেত্তয়া হলো:

আলো: এই ড্রানড্রবিয়াম অর্কিড বেশী প্রাকৃতিক আলো পছন্দ করে। কম আলোতে ও জন্মায় কিšতু, ফুল দিতে দেরী করে।

পানি: ছোট চারা গাছে প্রচুর পানি দিতে হয়। গ্রীষ্মকালে সপ্তাহে একবার পানি দেত্তয়া যেতে পারে। অর্কিড বড় হলে পানির প্রয়োজন কম খাকে। পূর্ণবয়স্ক ফুল ধরা অর্কিড গাছের শিকড়ে এবং পাতায় পানি স্প্রে  করতে হবে। অসাবধানতাবসত: ফুলে পানি লাগলে নরম টিসু কাগজ দিয়ে মুছে ফেলুন। রাতে পানি দিবেন না, এতে ফাঙাস পড়তে পারে। নিচের ভিডিওটি দেথুন



সার :  বাজারে বিভিন্ন  ধরনের গ্রোথ হরমোন পাত্তয়া যায় , নিয়মাবলী পড়ে অর্কিডের গোড়ায় এবং পাতায় স্প্রে করতে হবে।

যতœপাতি:  মরা পাতা তুলে ফেলুন ।  ড্রানড্রবিয়াম অর্কিড বেশী নড়াচড়া পছন্দ করে না । শীতকালে পানি বেশী দিবেন না । মাঝে মাঝে রোদে রাখুন। ফুল শুিিকয়ে গেলে ঠাটাটি কেঁঁটে ফেলুন। একছর পরপর পট বদলাতে হবে। নতুন পটে  নারিকেলের ছোবা, শুকনো নারিকেলের খন্ড রেখে তার উপর গাছটি বসিয়ে দিন। পুর্ণ বয়স্ক গাছে নতুন শিকড়সহ চারা গাছ জন্মায়, চারাগাছটি যতœ কওে তুলে নতুন পটে লাগালে আরেকটি অর্কিড গাছ পেয়ে গেলেন।

ড্রানড্রবিয়াম অর্কিড
বাজারদর: আঁগারগাঁও নার্সারীতে পাবেন । ১০০ টাকা থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। ফুলত্তয়ালা গাছ কেনাই ভালো। সাভারের এবং ময়মনসিংহের দীপ্ত নার্সরীতে যেতে পারেন।

ফটোশপ টিউটোরিয়াল : সিলেক্টটিভ কালার ব্যবহার করে আলোকচিত্রকে করুন নান্দনিক।

শীতের এই কুয়াশা ঝরা বিকেলে যখন লেখাটি লিখতে বসেছি, তখন মনটা চলে যাচেছ সুদুর গ্রামে, যখন গ্রামের মাঠে মাঠে ফসল কাটা শেষ হয়ে গেছে। কুয়াশার মেঘ ঝুলে আছে বিষন্ন শূন্য ধান ক্ষেতগুলোর উপরে।  গ্রামের ঘরে ঘরে পিঠা-পুলির আয়োজন চলছে। ধবল বক উড়ছে এখানে সেখানে । মনটাকে অনেক কষ্টে ফিরিয়ে আনলাম চারকোনা কম্পিউটারের মনিটরে। কারন আজকে আমি একটি ফটোশপ টিউটোরিয়াল শেয়ার করবো আপনারে সামনে। আপনারা হয়তো এমন অনেক ল্যান্ডস্কেপ ছবি দেখেছেন যেখানে পুরো পটভুমিটা সাদা-কালো কিন্তুু মানুষের ফিগারটি বা বিশেষ কোন সাবজেক্টটি রঙিন । ফটোগ্রাফির ভাষায় বলা হয় সিলেকটিভ কালার এফেক্ট। এই এফেক্টের ফলে ল্যাšডস্কেপে একটি নান্দনিক ভাব আসে।



ল্যান্ডস্কেপ-এ সাধারণত এ এফেক্টটি বেশী ব্যবহার করা হয়। অবশ্য যেকোন আলোকচিত্রে এই এফেক্টটি ব্যবহার করতে পারেন যা আপনার সৃজনশীলতার উপর নির্ভর করে।

প্রথমে  এ্যাডোব ফটোশপে  আপনার ছবিটি ওপেন করুন ।  Image মেনু থেকে  Duplicate-যেয়ে ছবিটির Duplicate করুন।  এখন যা কাজ হবে তা  Duplicate ছবিতেই হবে ।  আসল ছবিটি অক্ষত থাকবে । 

ধাপ-১: Image মেনু থেকে Mode-এ যান ।  Grayscale সিলেক্ট করুন।  Discard color information? নামে একটি উইন্ডো প্রর্দশিত হবে ।  ok  বাটনটি কিøক করুন।  ছবিটি গ্রে অথাৎ সাদা-কালো টোনে প্রর্দশিত হবে ।
ধাপ-২: পুনরায় Image মেনু থেকে  Mode যান ।  এইবার  RGB Color  সিলেক্ট করুন। এইবার টুলবক্স থেকে History Brush Tool(V) সিলেক্ট করুন ।


 ব্রাশ টুলটি আসবে ।  এই টুল ব্যবহার করে ছবির যে অংশটি রঙিন করতে চান, সেখানে  ব্রাশ করুন। মনে রাখবেন ব্রাশটি যেন সাবজেক্টের আউটলাইন অতিক্রম না করে ।  প্রয়োজনে  রাইট কিøক করে ব্রাশটির আকার ছোট বড় করে নিতে পারেন।  কাজ শেষ করে সেভ করুন ।



টিউটোরিয়ালটি ভালভাবে বোঝার জন্য নিচের ভিডিওটি দেখুন


রাতারগুল: জলমগ্ন অরণ্যে একদিন

 শুভ সালাতিন
পর্যটক,লেখক ও আলোকচিত্রী
১৬/১২/১৫,ঢাকা

বিছানাকান্দি থেকে যখন রাতারগুলে আসলাম তখন সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু । ছোট ঘাট। লোকজন তেমন নেই। ঘোটা পাচেক নৌকা ভীড়ে আছে। দরকষাকষি চলছে। এক কোনায় বেশ কয়েকজন দোহাতি লোক মাছের টুকলি নিয়ে বসে আছে। আমাদের তিনটি নৌকা দরকার। নৌকাগুলো দেশী নৌকার মতো। পার্থক্য শুধু দৈর্ঘ্যে। বেশ লম্বা। লগি-বৈঠায় চলে। তিনটি নৌকা ভাড়া করলাম। ভাড়া সর্বমোট ১৫০০ টাকা। একটু বেশীই মনে হলো। কি আর করা, শখের দাম তো লাখ টাকা।

Ratergul swamp forest
রাতারগুলে ভ্রমণকারী
কালো পানির উপর দিয়ে ধীরে ধীর এগিয়ে চললো নৌকা। রাতারগুল বনে প্রবেশ করতে আরও প্রায় মিনিট বিশেক সময় লাগবে। আপাতত আমরা নদীতে আছি। এই অবসরে প্রিয় পাঠক আসুন, রাতারগুল সম্পর্কে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে আসি।

রাতারগুল সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায় । এই জলজ বনভ’মি বছরের অর্ধেক সময় কোমর পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে। আয়তন প্রায় তিনহাজার তিনশত একুশ একর। এর মধ্যে ৫০০ একর মূল বনভ’মি এবং বাকি অংশ জলাশয় এবং কিছু উচু এলাকা।
রাতারগুলে ভ্রমণকারী
বর্ষাকালে ডুবে যায় পুরো এলাকা আর শীতকালে শুধু খনন করা জলাশয় ছাড়া বাকী এলাকা শুকিয়ে যায়। ২০১০-২০১১ সালে পাখির  নিরাপদ আবাসন হিসাবে প্রায় ৩.৬ বর্গকিলোমিটারের একটি বড় লেক খনন করে সিলেট বনবিভাগ।

রাতারগুলে পানির গভীরতা বেশ গভীর।কোথাও তা ২৫ ফুটেরও বেশী। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে রাতারগুল বনভ’মি। তারপরেও বনবিভাগ লাগিয়েছে বরুন,করচ,হিজল ও মুর্তাসহ আরও বেশ কিছু জলসহিষ্ণু গাছ। কদম,জালি বেত, অজুর্ণ সহ প্রায় ২৫ প্রজাতির গাছ দেখা যায়।

সিলেটের বিখ্যাত শীতল পাটির মূল উপাদান মূর্তার বড় অংশও আসে এই বন থেকে।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বনবিভাগ রাতারগুলের ৫০৪ একর এলাকাকে বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রম হিসাবে ঘোষনা দেয়। কাঠবিড়াল,উদবিড়াল,বানর,মেছোবাঘ ছাড়াও রয়েছে নানা প্রজাতির সাপ।
বাংলাদেশের একমাত্র জলজ অরণ্য

নানা প্রজাতির পাখি দেখা যায় রাতাগুল বনে-পানকৌডি,ঘুঘু,বালিহাসঁ,ফিঙে আর বিভিন্ন প্রজাতির বক।

নদীর কালো পানি ভেত করে এগিয়ে চলছে আমাদেও তিন নৌকা। হঠাৎ বায়ে বাক নিলো আমাদের প্রথম নৌকা। মাঝি বলল,“ এবার আমরা বনে ঢুকুম”। আমাদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিল। বনের প্রথমেই দেখা গেল মুর্তা গাছ। গাছগুলোর অর্ধেক অংশ পানির নীচে নিমজ্জিত। বাকী অংশ পানির উপরে।চারদিকটা ভীষণ নীরব। আমাদের নৌকা ছাড়া আর কোন নৌকা চোখে পড়লো না । ধীরে ধীরে বনের ভিতরে প্রবেশ করলাম । চারদিকে নাম না জানা গাছ পানির উপর ডালপালা মেলে দিয়েছে।
শুভ সালাতিন : লেখক ও আলোকচিত্রী, ছবি : অনন্যা
মাথার উপর ডালপালা যেন চাদোয়া বিছিয়ে দিয়েছে। মাথার উপর  ডালপালা । একটু দাড়ালেই গায়ে লাগবে। সূর্যের আলো না আসতে পারায় কেমন যেন গা-ছমছমে আবহ তৈরী হয়েছে। মাথার উপরে যখন ডালপালা ধীর লয়ে সরে যাচ্ছে, তখন সভয়ে উপরে তাকাই । এই বুঝি সাপ ঝুলছে! । রাতারগুলে আসার আগে অনেকে বলেছিল, এখানে নাকি গাছের ডালে ডালে সাপ দেখতে পাওয়া যায় । কিন্তুু, আমাদের কপাল খারাপ। কোন সাপ বাবাজির দেধা পেলাম না এ যাত্রায়। মাঝিকে জিজ্ঞেস করতেই সে জানালো,“ আগে আছিলো, অহন মানুষের আনাগোনা বাড়ছে, হাপ পাইবেন কনে?”। আগে যে বনভ’মি একদা ছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে, তা এখন মানুষের পদচারনায় মুখরিত। পানিতে ভেসে আছে, চিপসের প্যাকেট, খালি পানির বোতল,কলার খোসা। বেশ কয়েকটা নৌকা আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেল ঘাটের দিকে। সূর্য ডুবে গেছে। আমাদের সহযাত্রীরা তাড়াতাড়ি ফেরার জন্য উদগ্রিব । মাঝিরা অভয় দিলো। এই তো সামনে আর কিছু দুর গেলেই ওয়ার্চ টাওয়ার । কিন্তুু মনের মধ্যে কুডাক দিল। না এখনই ফিরতে হবে। রাতের বেলা এই রাতারগুলে নিরাপত্তা বলে কিছু থাকে না । তাই দিনের আলো থাকতে থাকতেই ফেরা সমুচিত। তাই ফিরে চললাম ঘাটের পানে, সাথে নিয়ে চললাম রাতারগুলের জন্য একরাশ ভালবাসা।


অশ্বত্থের সন্ধ্যার হাত্তয়া যখন লেগেছে নীল বাংলার বনে
মাঠে মাঠে ফিরি একাঃ মনে হয় বাংলার জীবনে স্কংট
শেষ হয়ে গেছে আজ;-চেয়ে দ্যাখো কতো শত শতাব্দীর বট
হাজার সবুজ পাতা লাল ফুল বুকে ল’য়ে শাখার বাজনে
আকাংখার গান গায়- অশ্বত্থেরা কি যেন কামনা জাগে মনে:
                                                          -জীবনানন্দ দাশ

কিভাবে যাবেন

প্রথমে সিলেট শহরে  যেতে হবে। ঢাকা থেকে সড়কপথে,রেলপথে কিংবা আকাশপথে সিলেট আসতে হবে। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও সিলেটে আসা যায়।

বাস ছাড়ে

মহাখালী, ফকিরাপুল ও সায়দাবাদ

এসি বাস: গ্রীন লাইন পরিবহন, সৌদিয়া এস আলম,শ্যামলী ও এনা পরিবহন ।
ভাড়া: ৮০০ টাকা থেকে ১১০০ টাকা ।

নন-এসি বাস: শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ,ইউনিক সার্ভিস,এনা পরিবহন ।
ভাড়া: ৪০০ টাকা-৪৫০ টাকা

ট্রেন: কমলাপুর থেকে

পারাবাত এ∙প্রেস-৬ টা ৪০ মিনিটে। ( মঙ্গলবার বাদে)
জয়ন্তিকা এ∙প্রেস-প্রতিদিন দুপুর ২ টায়
উপবন এ∙প্রেস-রাত ৯ টা ৫০ মিনিটে ( বুধবার বাদে)
কালনী এ∙প্রেস-বিকাল ৪ টায় ( শুক্রবার বাদে)

ট্রেন : চট্টগ্রাম থেকে

পাহাড়িকা এ∙প্রেস-সকাল ৮ টা ১৫ ( সোমবার ছাড়া)
উদয়ন এ∙প্রেস-রাত ৯ টা ৪৫ ( শনিবার ছাড়া)

আকাশপথে : ঢাকা থেকে

শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর থেকে সিলেট যায়-নভোএয়ার, ইউ.এস বাংলা,ইউনাইটেড এয়ার।

রাতারগুলে যাওয়ার জন্য প্রাইভেট কার, মাইক্রো বাস ভাড়া পাওয়া যায়। যদি বাজেট ভাল থাকে, তাহলে এই ধরনের যানবাহন ভাড়া নিতে পারেন। আর যদি বাজেট টাইট হয়, তাহলে আম্বরখানা, শাহজালাল মাজার থেকে সাহেব বাজার কিংবা চৌমুহনি পর্যন্ত লোকাল অটো রিক্শা ভাড়া নিতে পারেন। চৌমুহনী থেকে হাতের বায়ে ১ কিলোমিটার গেলেই রাতারগুল। ভাড়া জনপ্রতি ৪০ টাকা থেকে ৪৫ টাকা । অবশ্য রির্জাভ নিলে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে।


রাতারগুলে ভ্রমণ করার জন্য ছোট ছোট খোলা নৌকা ভাড়া নিতে হবে। দরকষাকষি করা ভাল। নৌকা ভেদে ভাড়া ৩০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

সাবধানতা: রাতারগুল বাংলাদেশের একমাত্র জলজ বনভ’মি । নৌকায় ভ্রমনকালে পানিতে কোন পলিথিন কিংবা খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ ফেলবেন না । সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট সাথে নিন। সাপ কিংবা জোঁক থেকে সাবধান । গাছের ডালে সাপের আনা গোনা থাকতে পারে। কপাল ভাল বা খারাপ থাকলে সাপের দেখা পেতেও পারেন। আমি কিন্তুু দেখিনি। নৌকায় পাঁচজনের বেশী উঠবেন না । উল্টে যেতে পারে। ছাতা অবশ্যই রাখবেন।